মাটির মায়ার মাহফুজ

SHARE

পরিপাটি কার্যালয়। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে ২৪ ফুট লম্বা একটি ‘প্রোফাইল বক্স’। তাতে কর্মীদের ছবি দিয়ে কার কী দায়িত্ব, তাঁদের মুঠোফোন ও কক্ষ নম্বর লিখে রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিটি কক্ষে সিসি ক্যামেরা।

কার্যালয়ের পূর্ব পাশে ছোট্ট একটি কক্ষ। নাম ‘মাটির মায়া’। তাতে একটি রেজিস্টার খাতা নিয়ে বসে আছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম মাহফুজুর রহমান। তার পেছনে লেখা ‘আপনার এসি ল্যান্ড।’আর তার সামনে দুই সারিতে বসে আছেন সেবাপ্রার্থীরা। এক এক করে নিজ নিজ জমিজমার সমস্যার কথা বলছেন তাঁরা। দেখে মনে হবে, চিকিৎসক চেম্বারে রোগী দেখছেন, ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। পুরো গল্পটি ঢাকায় ‘মাটির মায়া’ শিরোনামে সম্প্রতি ছাপা হয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায়। ইয়ুথ জার্নাল-এর পাঠকদের জন্য ফিচারটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

13925879_10210527712855692_3813702180233845537_o

এই চিত্র রাজধানীর কোতোয়ালির রাজস্ব কার্যালয়ের। জমিজমার সমস্যা নিয়ে যাঁরা এই কার্যালয়ে আসেন, তাঁরা যাতে দালালদের হাতে না পড়েন, সে জন্য এই সেবাব্যবস্থা চালু করেছেন এসি ল্যান্ড মাহফুজুর রহমান। এ কাজের প্রেরণা তিনি পেয়েছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার সাবেক এসি ল্যান্ড শাহাদত হোসেনের কাছ থেকে।

13901591_10210527706135524_2027656068660952664_n

দালালের দৌরাত্ম্য থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে দোতলা অফিসকক্ষ ছেড়ে নিচে টিনের চালায় টেবিল–চেয়ার নিয়ে নেমে এসেছিলেন তিনি। পেছনে ব্যানার টানিয়ে লিখলেন ‘আপনার এসি ল্যান্ড’। শাহাদত হোসেনের উদ্ভাবনী উদ্যোগ ‘মাটির মায়া’কে সফলভাবে অনুসরণ করে কোতোয়ালির রাজস্ব সার্কেলের চেহারা বদলে দিলেন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান।

13937809_10210527709575610_8629091789081151303_oগত বছরের ২৮ আগস্ট এই কার্যালয়ে যোগ দেন মাহফুজুর রহমান। তিনি এসে দেখেন তাঁর কার্যালয়ে দালালদের দৌড়ঝাঁপ। কাজের জন্য কেউ এলেই তাদের খপ্পরে পড়তেন। তাই দালালদের হাত থেকে সেবাগ্রহীতাদের রক্ষায় মাঠে নামেন তিনি। গত ৩ এপ্রিল এই কার্যালয়ের নতুন সেবাব্যবস্থার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ।

কার্যালয়ের চারপাশের দেয়ালে নামজারির সাইনবোর্ড ও ব্যানার টানানো। তাতে জমির নামজারি ও খতিয়ান তুলতে কত টাকা লাগবে এবং কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে, সব তথ্য লেখা আছে। এ ছাড়া কার্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই পূর্ব পাশে রয়েছে হেলপ ডেস্ক। সেখানে একজন কর্মী বসে আগত ব্যক্তিদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করছেন। আগত ব্যক্তিদের কাউকেই কার্যালয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে দেখা যায়নি।

জমির নামজারি–সংক্রান্ত কাজে কোতোয়ালি রাজস্ব সার্কেলে এসেছিলেন বাংলাবাজারের বাসিন্দা রঞ্জন দাস। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আগে এই কার্যালয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য ছিল। কর্মচারীরা অবহেলা করতেন। অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু এবার সেসব নেই। সব বদলে গেছে।
13938093_10210544839323843_1553505030793353126_o
সাধারণ মানুষ যাতে অফিসে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহজেই খুঁজে পায়, সে জন্য কর্মচারীদের গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র। প্রতিটি কক্ষে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা। কক্ষে বসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন মাহফুজুর রহমান।

ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের প্রতি আন্তরিকতা দেখে অবাক হয়েছেন শাঁখারীবাজারের বাসিন্দা পারভেজ হাসান। তিনি বলেন, দুই বছর আগে নামজারির কাজে এই অফিসে এসেছিলেন তিনি। ওই সময় তাঁর কাছে পাঁচ গুণ বেশি টাকা নিয়েছিলেন এক কর্মচারী।

ভূমি কার্যালয়ের কানুনগো (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মহব্বত হোসেন খান বলেন, এই কার্যালয়ে আবেদনকারী ব্যতীত কোনো আবেদন গ্রহণ করা হয় না। তবে যৌক্তিক কারণ থাকলে ওয়ারিশদের মাধ্যমে আবেদন নেওয়া হয়। এতে দালালেরা আর কার্যালয়ে ঢুকতে পারে না। মানুষ সরাসরি এসি ল্যান্ডের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন।
14064314_10210550470744625_6612038509276143161_n
এসি ল্যান্ড মাহফুজুর রহমান বলেন, তাঁর মুঠোফোন ও ল্যাপটপেও সিসি ক্যামেরার ছবি সংযুক্ত করা আছে। ফলে যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে বসে অফিসের সব কার্যক্রম দেখতে পারেন তিনি। এতে আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতনভাবে কাজ করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আগে একটা নথি খুঁজে বের করতেই দিন পার হয়ে যেত। এই ঝামেলা থেকে রক্ষায় রিট পিটিশন মোকদ্দমা, দেওয়ানি মোকদ্দমা, নামজারি রিভিউ মোকদ্দমা, রেন্ট সার্টিফিকেট মামলা, পিটিশন মোকদ্দমা ও তদন্ত–সংক্রান্ত নথি সংরক্ষণের জন্য পৃথক ফাইল কভার প্রণয়ন করে ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে। মোকদ্দমাসমূহের নম্বর নিয়ে কম্পিউটারে ডেটাবেইস করা হয়েছে। এ ছাড়া অফিসে ব্যবহৃত এসএ, আরএস, সিটি ও সিটি নামজারির মোট ৫৭৯টি খতিয়ান বই লালসালু কাপড় দিয়ে বাঁধাই করে ধারাবাহিকভাবে নম্বর প্রদান করা হয়েছে। ক্রমানুসারে রেকর্ডসমূহকে আলাদা তাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটি রেকর্ডের সঙ্গে ট্যাগ লাগানো আছে। এখন যেকোনো নথি এক মিনিটের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

13925473_10210527714375730_5823109409665329091_o

আবেদনকারীকে অনেক ক্ষেত্রেই শুধু নামজারি বা মিস কেসের আবেদনের বর্তমান ও সর্বশেষ অবস্থা জানতে ভূমি অফিসে যেতে হয়। কখনো কখনো কেবল একটি তথ্যের জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

মাহফুজুর রহমান বলেন, বর্তমানে নামজারি ও বিবিধ মামলার শুনানির তারিখ বাদী ও বিবাদীকে মোবাইলে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ভূমি অফিসের ওয়েবসাইটের মাধ্যমেও নামজারি ও বিবিধ মামলাসহ অন্যান্য আবেদন অনলাইনে দাখিল করার সুযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন মামলার সর্বশেষ অবস্থা ও অভিযোগ ওয়েবসাইট থেকে জানানো যাবে। কার্যালয়ের ভেতর সবার জন্য ফি ওয়াই–ফাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

14079885_10210550471704649_1991221552567952913_n

ভূমি অফিসের সেবা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কি না? তা জানতে ‘আপনার সন্তুষ্টি বক্স ও অভিযোগ বক্স’, মতামত বোর্ড ও গণমন্তব্য রেজিস্টার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) উপস্থিতিতে এসব বক্স খুলে দেখা হয়। কোনো অভিযোগ থাকলে তা পর্যালোচনা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

গত ১৪ মে বিকেলে আপনার সন্তুষ্টি বক্স ও অভিযোগ বক্স খোলেন সদ্য সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শহীদুল ইসলাম। এর মধ্যে ৮৯টি সন্তুষ্টি ও ৫টি অসন্তুষ্টির চিঠি পাওয়া গেছে। এতেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে পরিদর্শন বইতে এই ভূমি দপ্তরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন শহীদুল ইসলাম।

ভূমি কার্যালয়ের পরিদর্শন খাতায় ইসলামপুরের বাসিন্দা শফিউল লিখেছেন, বাড়তি সময় ও টাকা ছাড়া এত সহজে জমিসংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করায় কোতোয়ালি ভূমি অফিসকে ধন্যবাদ।

জানতে চাইলে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, সরকারি অফিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা দূর করা এবং সেবার মান উন্নয়ন করতে ওই কার্যালয়ের অবকাঠামোগত সংস্কারসহ অন্যান্য উন্নয়ন করা হয়েছে। এখন মানুষ কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই সেবা নিতে পারছেন।

সূত্র: প্রথম আলো ছবি: জনাব মাহফুজুর রহমান এর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে নেয়া