ক্যারিয়ার প্লানিং: মাঝপথে এসে অনিশ্চয়তার সমাধান কী?

SHARE

মুস্তাফিজুর রহমান:

ক্যারিয়ার প্লানিং জীবনের শুরু থেকেই করা উচিৎ। মাঝপথে গিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবলে আশানুরুপ ফল পাওয়া যায় না – এমন কথা বহুবার গুরুজনের কাছে শুনেছেন। কিন্তু গুরুত্ব দেননি। এখন শিক্ষা জীবনের মাঝপথে বা শেষপ্রান্তে এসে যখন ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছেন তখন দেখছেন সামনে সবটাই গোলমেলে, ধোয়াশা, অনিশ্চিত। এখন কী করবেন, কোন পথে যাবেন; এসব নিয়ে খুব চিন্তিত। কিন্তু সমাধান তো একটা বের করতেই হবে! শিক্ষা জীবনের মাঝপথে এসে ক্যারিয়ার প্লানিং করতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন, ভয় পাচ্ছেন অথবা ভাগ্য আপনার সাথে বারবার প্রহেলিকার খেলা খেলছে। এমন সময় কী করা যায়? এমন সময় নিজেদের খুব সময়পযোগী, তড়িত, যথার্থ এবং বিচক্ষণ কিছু শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আরও বিষদভাবে বলতে চাই –

নিজের মতো হউন

অমুক বন্ধুর মতো ব্যাংক কর্মকর্তা হতে পারলে ভাল হতো। পাশের বাড়ির ভাইয়ের মতো একটা সরকারী চাকরি যদি পেতাম! ছোট ভাইয়ের মতো কম্পিউটারে বসে বসে ফ্রিল্যান্সিং করলে বাড়িতে বসেই সব কাজ করতে পারতাম। মামার মতো ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার হলে সত্যিই জীবনটা বদলে যেত। অথবা পাশের বাড়ির আপুর মতো একটা বুটিকস্ হাউজ দিলে ভালোই চলত।

না, এই ভাবনাগুলো একদম ভুল। অমুক হয়েছে বলে আমাকে হতে হবে বা অমুকের মতো হতে হবে – এমনটা ভাবা নির্বুদ্ধিতা, কখনো কখনো ভয়ানক পরিণতির কারণ। অন্যের সাফল্যের মোহে পড়ে তাকে অনুকরণ করতে গিয়ে যদি ব্যর্থ হন, তাহলে আপনি ভয়ানক ডিপ্রেশনে (বিষণ্ণতা) ভুগতে শুরু করবেন। হতেই পারে, অন্য একজনের মতো হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট যে যোগ্যতা দরকার তা আপনার নেই। অথচ আপনি অন্য একটা কাজ ওই কাঙ্খিত ব্যাক্তির চেয়ে ভালো পারেন, কিন্তু তার প্রতি মোহের কারণে নিজের দিকে নজর দিচ্ছেন না। তাহলে ক্ষমতা থাকা সত্বেও আপনি ব্যর্থ হবেন।

অন্য কারো মতো নয়, আপনি একান্ত নিজের মতো হয়ে উঠুন। আপনার ভালবাসার জায়াগা কোথায় সেটা খুজে বের করে তাতে মনোযোগ দিন, আপনার সুন্দর ক্যারিয়ার আপনা থেকেই গড়ে উঠবে।

নিজেকে সমৃদ্ধ করুন

এই ছোট কথাটির বিশাল ব্যাখ্যা হতে পারে, বৃহৎ প্রস্তুতির ভাবনা আসতে পারে। আবার উল্টো ব্যাখ্যাও কিন্তু হতে পারে! যেমন আমি বলব, চুপচাপ আকাশের দিকে দশ মিনিট তাকিয়ে থাকাও নিজেকে সমৃদ্ধ করা। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা জীবনকে সমৃদ্ধ করে। আমি ২০১২/১৩ সালে একটা শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে দক্ষিণ বঙ্গের অনেকগুলো মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছি। সেখানে দেখেছি, শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের জ্ঞানকে শুধুমাত্র ক্যারিয়ার গঠনের তথা তাদের বয়স অনুযায়ী ভালো মার্কস পাওয়ার হাতিয়ার মনে করে আর তার যাপিত জীবনকে তার পারিপার্শ্বিকতা, সমাজের প্রচলিত ধারণা আর সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন জ্ঞান দিয়ে পরিচালিত করে। আর অদ্ভুতভাবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর এই ধারণা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত রয়ে যায়!

নিজেকে সমৃদ্ধ করার অর্থ হলো, এই গন্ডি থেকে বের হয়ে আসা। জীবনের অর্জিত জ্ঞান কেবল আলাদাভাবে ক্যারিয়ার গঠনের হাতিয়ার না ভেবে দৈনন্দিন জীবনে, চিন্তায়, দর্শনে ধারণ করা। মনে রাখতে হবে, আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি কেবল মাত্র চাকরি পাওয়ার জন্য নয়। নিজেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে।

আমরা যেহেতু গণতান্তিক রাষ্ট্রে বাস করি – আমাদের ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকায় সরকার চলে – তাই অর্থনীতির ছাত্র না হলেও আমাকে অর্থনীতি জানতে হবে। যেহেতু আধুনিক বিশ্বে বাস করি, তাই আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিও বুজতে হবে। যেহেতু প্রযুক্তির এক মহা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি, তাই সময়পযোগী প্রযুক্তিজ্ঞানও থাকতে হবে। এখন এই সবগুলো ব্যাপার যদি কেবল চাকরি পাওয়ার জন্য জানতে হয়, তাহলে আপনার কাছে মনে হবে এটা বিশাল একটা জার্নি। অথচ যদি নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য জানতে হয় তাহলে ব্যাপারটা খুবই হালকা।

আপনি অন্তত রোজ পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন, উপসম্পাদকীয়ও মিস করবেন না। কোনো কিছুই মুখস্থ রাখার দরকার নেই, কেবল বুঝে বুজে পড়ে যান। এক বছর পর আপনি কোনো ইন্টারভিউ বোর্ডে গেলে পরীক্ষকরা আপনার চেহারায় ফুটে ওঠা দীপ্তি দেখে বুঝে যাবে আপনার মধ্যে কী আছে, আপনি কতটা গুণী। একজন মানুষ যত জ্ঞানীই হোক পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই। সুতরাং ইন্টারভিউ বোর্ডে সব প্রশ্নের উত্তর পারাটাই মুখ্য বিষয় নয়। সার্বিকভাবে নিজেকে উপস্থাপন করই আসল। আর এর জন্য প্রয়োজন নিজেকে সমৃদ্ধ করা।

স্বপ্ন পরিবর্তন

স্বপ্ন পরিবর্তনের কথা শুনে নিশ্চয় ঘাবড়ে গেছেন! পৃথিবীর সব সফল প্রেরণাদায়ী মানুষ নিজের স্বপ্নকে আকড়ে ধরতে বলেন। স্বপ্নকে বাচিয়ে রাখতে বলেন, বলেন স্বপ্নেই বাঁচো! অথচ আমি কেন স্বপ্ন পরিবর্তনের কথা বলছি?

আপনারা হয়তো এই মহুর্তেই পৃথিবী বিখ্যাত দশ বারো জন সফল মানুষের নাম এবং কর্মের কথা বলে দিতে পারবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন তো? এই একই সময়ে দশ বারো জন ব্যর্থ মানুষের নাম বলতে পারবেন? পারবেন না! কেননা, ব্যর্থদের মহাকাল মনে রাখে না, মনে রাখেন না আপনিও! অথচ সাফল্যের শীর্ষে ওঠা গুটি কতক মানুষের বিপরীতে লক্ষ লক্ষ ব্যর্থ মানুষের সংখ্যাই বেশি।

ধরুন, আপনি স্কুলে পড়াকালীন ঠিক করেছিলেন বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। সে অনুযায়ী মন দিয়ে পড়াশোনা করলেন। এসএসসি ও এইচএসসি তে জিপিএ ৫ অর্জন করলেন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিলেন ভালো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ভর্তি পরীক্ষার দিন আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। পরীক্ষা ভালো হল না। আপনি মেডিকেলে চাঞ্চ পেলেন না! এবার কী করবেন? আপনি কি পড়াশোনা ছেড়ে দিবেন? নাকি মেডিকেলের শোকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও খারাপ করবেন? অথবা ধরুন আপনি পড়তে চেয়েছিলেন তড়িৎ কৌশল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চ পেলেন পদার্থ বিজ্ঞানে। তাহলে কি তড়িৎ কৌশলের চিন্তায় তড়িতাহিত হয়ে পদার্থ বিদ্যায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলবেন?

মনে রাখবেন, জীবন একটাই। এখানে দ্বিতীয়বার নতুন করে শুরু করার সুযোগ নেই। কাজেই নিজের মধ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি সঞ্চার করতে হবে। দশ বছরের তড়িৎ প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দশ মিনিটেই পাল্টে পদার্থবিদ হয়ে যান। নিজেকে ডায়নামিক (বহুমাত্রিক) করে গড়ে তুলতে হবে। সুনির্দিষ্ট কোন স্বপ্ন পুরণ না হওয়ার শোক করলে বরং জীবনের কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়তে পারেন।

সময়ের এক ফোড়, অসময়ের দশ ফোড়

ধরুন, আপনার জীবনের লক্ষ্য একজন সরকারী কর্মকর্তা হওয়া। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (যে কোন বিশ্ববিদ্যালয হতে পারে) থেকে মাস্টার্স পাশ করার পর ক্রমাগত বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু উত্তীর্ণ হতে পারছেন না। আবার বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অন্য কোনো ফুলটাইম চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না। এদিকে বাড়িতে আপনার মা অসুস্থ, ছোট বোন স্কুলে আর বয়সের ভারে আপনার মাথার চুল পড়তে শুরু করেছে। আপনি কি এখনও বিসিএসের আশায় মেস বাড়ির ছোট্ট কামরায় সাধারণ জ্ঞানের চর্চা করতে থাকবেন? চেষ্টা করলে থাকলে আরও তিন চার বছর পর হয়তো আপনি একটা সরকারী চারুরী জোটাতে পারবেন। কিন্তু ততদিনে চিকিৎসার অভাবে আপান মা মারা যাবে। ছোট বোনের লেখাপড়া বিঘ্নিত হবে। আর নিজের মাথা ফাকা হওয়ার দরুন বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজে পাবেন না।

কাজেই এখানেও বলব নিজেকে ডায়নামিক হতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে পস্তাতে হবে জীবনভর।
স্বপ্ন ও বিশ্বাস দুটো আলাদা জিনিস

স্বপ্ন আর বিশ্বাস দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। আমরা এই দুটো ব্যাপার গুলিয়ে ফেলি। না, আমি এখানে ঘুমের মধ্যে দেখা অবচেতন মনের স্বপ্ন বা ধর্ম বিশ্বাসের কথা বলছি না। আমি ক্যারিয়ারের কথা বলছি।

যেমন: “আপনি হয়তো স্বপ্ন দেখেন একজন বৈমানিক হওয়ার আর বিশ্বাস করেন যে একদিন আপনি নিশ্চয় সফল হবেন।” এই ভাবনাটা খুবই যথার্থ। কিন্তু যদি বলি, “আপনি হয়তো স্বপ্ন দেখেন একদিন সফল হবেন আর বিশ্বাস করেন একদিন নিশ্চয় বৈমানিক হবেন।” বাক্যটা কেমন দুর্বল হয়ে গেলো, না? স্বপ্নের সাথে সময়ের একটা যোগসুত্র আছে কিন্তু বিশ্বাসের সাথে সময়ের কোন যোগসুত্র নেই। অর্থাৎ বৈমানিক হতে একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত সময় থাকে। তাই বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন ঠিক আছে। আর সফল আপনি হবেন, সেটা বৈমানিক না হয়ে একজন ব্যবসায়ী হিসাবেও হতে পারেন, এখানে সময়ের ব্যাপার নেই। কাজেই দুটো ব্যাপার আলাদা। এই দুটো গুলিয়ে ফেললে কারিয়ারও গুলিয়ে যাবে। আপনি খুবই বিচক্ষণ হতে পারেন কিন্তু যদি স্বপ্ন আর বিশ্বাসের তফাত না জানেন তো নিশ্চিত পস্তাবেন। কাজেই স্বপ্ন দেখুন আর বিশ্বাস রাখুন।