দ্রুক ডায়েরি-১: ড্রাগনের দেশে

SHARE
নবকুমার দত্ত:
চঞ্চল ইঁদুরের মতো একটা ক্ষিপ্র দৌড় শেষ করে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে শূন্যে উড়াল দিলো উড়োজাহাজ। যেনো উচ্চলম্ফের এথলেট শক্তি সঞ্চয়ের দৌড়টুকু শেষ করে মিটার কয়েক উড়ে গিয়ে মাটিতে নেমে এলো। পার্থক্য হলো দ্রুক এয়ারের এয়ারবাসটি কয়েকশত মাইল দূরের ড্রাগনের দেশ হিম হিম ভূটানে গিয়ে উচ্চলম্ফ শেষ করেছে। ট্যাক্সিং করে থামার পর উড়োজাহাজের পেট থেকে সুড়সুড় করে নেমে এলাম বিভূঁইয়ের মাটিতে।

পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
চারদিকে গ্রীবা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতের কোল জুড়ে বিস্তার করে থাকা ‘পারো ভ্যালিতে’ নেমে আসার পর হিমের ছুরি ফালাফালা করতে লাগলো গায়ের উন্মুক্ত চামড়া। রোদ যে এতো ঝকঝকে উজ্জ্বল হতে পারে তা হয়তো আমার অজানাই থাকতো চিরকাল যদি না শান্ত সুনিবিড় সুনসান দেশটিতে যেতাম।
যে শহরে নেমে এসেছিলাম তার নাম ‘পারো’। সুবিশাল পারো ভ্যালি জুড়ে ছবির মতো টাউন পারো। পর্বতের ভাঁজে ভাঁজে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে একটা দুটো বাড়ি। প্রতিটি বাড়ির সজ্জা ভূটানিজ সংস্কৃতিকে ঘোষণা করছে। বাড়ির নকশা, দেয়ালে আঁকা ছবি, প্রেয়ার ফ্ল্যাগ ইত্যাদিসহ চোখে আরাম দেয়া একটা প্রকৃতি। কোনো কোনো বাড়ির দেয়ালে বিশাল করে আঁকা পুংলিঙ্গের চিত্র দেখে প্রথমে ভড়কে গেছিলাম। পরের কোনো পর্বে এ নিয়ে বলবো।

প্রেয়ার ফ্ল্যাগ
গাড়িতে করে রিসোর্টে যাওয়ার পথে বাড়িগুলো দেখতে দেখতে সকল বাড়ির কমন সদস্য মনে হলো গাবদাগোবদা কুকুরদের। এদের মনে হয় খাবারের কোনো অভাব নেই এবং অত্যধিক আদর পেয়ে থাকে। সদ্য শ্যাম্পু করে স্নান করে আসা রোমশ নরম শরীর এদের।
রাস্তা গুলো সর্পিল। যেনো পাহাড়ের গা বেয়ে চলেছে একটা মস্ত অজগর। আমরা তার সওয়ারী।
পারো ভ্যালির বিস্তীর্ণ বুক জুড়ে পাথরের জামা গায়ে দিয়ে ষোড়শী কিশোরীর মতো উদ্দাম অথচ ধীর মন্থর গতিতে লাফিয়ে চলেছে নদী ‘পারো চূ’। ‘চূ’ মানে জল। পশ্চিমের কোনো পর্বতের বুক চিড়ে জন্ম নিয়েছে ‘পারো চূ’। কাচের মতো স্বচ্ছ এক হাঁটু জল। বর্ষায় হয়তো আরো কিছুটা জলজ যৌবন যুক্ত হয় পারো চূ’র বুকে। ভ্যালির ধাপে ধাপে দাইয়ে নেয়া ধান গাছের গোড়া সাক্ষ্য দিচ্ছে এই পাথুরে পর্বতও স্বর্ণগর্ভা।

পারো চূ
বাইরে অবিরাম তুমুল হিম বাতাস বইছে। সর্বত্র প্রেয়ার ফ্ল্যাগ গুলো উড়ছে। নীল, শাদা, লাল, সবুজ, হলুদ এই পাঁচটি রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছেই অনেক কাল ধরে। উড়তেই থাকবে যতদিন না শ্লোকসমেত প্রতিটি সুতা উড়ে উড়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিঃশেষ হয়ে মিলিয়ে যায়। পাঁচটি রঙের ভিন্ন ভিন্ন মানে রয়েছে। যেমন- আকাশকে বোঝাচ্ছে নীল রংটি, তেমনি শাদা দিয়ে বাতাস বোঝায়, অগ্নি বোঝায় লাল রং, সবুজ দিয়ে জল এবং হলুদ দিয়ে পৃথিবী বোঝায়। এই পাঁচ রং আবার পাঁচটি পবিত্র আলোর সংকেত। প্রাগৈতিহাসিককাল ধরে স্থির হয়ে শুয়ে থাকা পাথুরে পর্বতের গায়ে গায়ে, ঋজু গাছের শাখে শাখে, ছোপ ছোপ এবস্ট্রাক্ট পেইন্টিঙের মতো ভূটান জুড়ে হিম হাওয়ায় উড়ছে পাঁচ রঙা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ।
গম্ভীর পাথুরে পাহাড়ের মতো মানুষগুলোও ধীরস্থির, শান্ত। যেনো সারা দিনরাত প্রার্থনায় রত। একটুখানি মৃদু শব্দেও যেনো প্রকৃতির ধ্যান ভেঙে যাবে। তাই পারো চূ নদীর মতোই তারা চলেছে নিঃশব্দে।
সব এলাকার বা দেশের আলাদা একটা গন্ধ আছে। বাংলার মেঠো পথের উপর যখন বর্ষার প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ে তখন একটা সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায়। আবার পাকা ধানের সোনালী মাঠে একটা ধেনো গন্ধ পাওয়া যায়। হিন্দু পাড়ায় ধুপের গন্ধে একটা ধ্যানস্ত নরোম প্রকৃতি পাওয়া যায়। তেমনি ভূটানের বিচিত্র বঙ্কিম পথে একটা পাথুরে গন্ধ আছে। ইউক্যালিপটাসের গন্ধ, ধুপের গন্ধ মিলেমিশে একটা ভিন্ন শান্ত নিবিড় গন্ধ উৎপাদন করেছে দেয়ালে দেয়ালে, ঘরে ঘরে। ভিজিয়ে রাখা সুপারির গন্ধ সর্বত্র। এর কারণ সিংহভাগ ভূটানিরা ‘দোমা’ খেতে বেশ পছন্দ করে। দোমা হলো পান আর ভিজিয়ে রাখা সুপুরি সমেত একটা চর্ব। কেউ কেউ পান ছাড়া শুধু সুপারি মুখে পুড়ে রাখে। আর চিবোতে থাকে।
এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় আধঘন্টার একটা ছোট্ট ড্রাইভ শেষে একটা রিসোর্টে গিয়ে উঠলাম। মেটা রিসোর্ট। মূল পথ থেকে ঢালু একটা উঁচু পথ চলে গেছে মেটা রিসোর্টের দিকে। পথের ধারে অবিরাম বয়ে চলেছে পারো চূ। দৃষ্টি জুড়ে সান্ত্রির মতো দাঁড়িয়ে আছে পর্বত।
আকাশ এতো নীল হতে পারে! পারোর আকাশ যতটা পারা যায় ততটাই নীল ধরেছে বুক জুড়ে। ভুলেও এক আঁচড় শাদা মেঘের ছাপ দেয় নি প্রকৃতি পারোর আকাশে।
গাড়ি থেকে নেমে ছোট্ট লন পেড়িয়ে রিসিপশন। ইউক্যালিপটাসের কড়া গন্ধ সর্বত্র। মেটা রিসোর্টে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আরো একটু উপরের দিকে পর্বতের হাঁটু থেকে উড়োর দিকে আরেকটি হোটেলে, এর নাম নমছি, জায়গা করে দেয়া হলো। হোটেল রুমের হিটারের সামনে বসে যেনো জীবন খুঁজে পেলাম। ঠান্ডায় জমে যাওয়া অসাড় হাত পায়ে রক্তের চাঞ্চল্য বাড়লো উষ্ণতার পরশ পেয়ে। করুণ হিম ভূটানে উষ্ণতা বড়োই আরাধ্য। সে যদি হয় প্রেয়সীর দেহ নিঃসৃত নরোম পেলব উষ্ণতা তাহলে তো কথাই নেই।

রিসোর্ট
আরো কিছু গরম কাপড় শরীরে চাপিয়ে যখন বাইরে এলাম, তাপমাত্রা বোধ করি হিমাংকের কাছাকাছি ছিলো। সাথে বাতাস তো আছেই। হোটেলের লবিতে বসে ছিলাম অন্যদের অপেক্ষায়। চট করে একটা কর্নারে চোখ আটকে গেলো। ওখানে সকল সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো এক মঙ্গোলিয়ান অপ্সরী। আমি আমার বেহায়া নজর টেনেও সরাতে পারি নি। ঝকঝকে একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো অপ্সরী। আমার চোখে মস্তিষ্কের নিউরণে নিউরণে ছুটোছুটি পড়ে গেলো। ভূটানিজ কিরা ও তেগো পরিহিত অপূর্ব নারীমূর্তি সৌন্দর্যের এক নতুন সংজ্ঞা হয়ে এলো।
সৌন্দর্যের দারুণ এক শকের ধাক্কা সমস্ত গায়ে একটা অসাড় অনুভূতি দিয়ে গেলো। যাইহোক, পারো টাউনে গেলাম দুপুরের খাবার খেতে। ভূটানে খাবারের দোকান গুলোতে মেন্যু চার্টের সাথে এক টুকরো কাগজ আর কলম ধরিয়ে দেয় খাবারের চাহিদা লিখে দেয়ার জন্য। তারপর বিশ-ত্রিশ মিনিট পরে সদ্য রান্না করা খাবার সার্ভ করে টেবিলে। আমাদের অস্থির বাঙালি চরিত্রের সাথে এটা খুব সাংঘর্ষিক। আমরা খাবার দিতে দেরি হলে এমনকি বউ তালাক দিয়ে অভ্যস্ত। সেখানে খাবারের অর্ডার দিয়ে আধঘন্টা বসে থাকা এক চরম শাস্তি। দোকানের দেয়ালে ওয়াইফাই লেখা দেখে ফোন খুলে ইন্টারনেট সংযোগ দিতে চেষ্টা করলাম। হচ্ছিলো না। ভালো করে আবার দেয়ালে তাকিয়ে দেখি ওখানে লেখা আছে ‘We don’t have WIFI, talk with each other’. ব্যাপারটার নতুনত্বে বেশ ভালো লাগলো। আজকাল আমরা তো ভার্চুয়াল চ্যাট এ অভ্যস্ত, মুখোমুখি চোখে চোখ রেখে চ্যাট করার সময় আমাদের কম। আমরা হারিয়ে যাচ্ছি ভার্চুয়াল জগতের কৃষ্ণগহ্বরে। হয়তো একটা সময় খুঁজে ফিরবো একে অন্যকে। একটু নরোম উষ্ণ ছোঁয়ার জন্য, একটু বুকের কাছাকাছি গুটিসুটি মেরে থাকার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাবো হয়তো; কিন্তু অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে পাবো না কেউ কাউকেই।
খাবারের হোটেল গুলোতেও পালিত বিড়াল কুকুরের অবাধ বিচরণ। এরা দৌড়াদৌড়ি করছে, হুটোপুটি করছে নিজের মতো।
পারো টাউন থেকে গাড়ি আমাদের নিয়ে গেলো ক্লিফে অর্থাৎ পর্বতের গা কেটে তৈরি করা মন্দির ‘টাইগার নেস্ট’ দেখতে। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে মাথা দেখা যেমন, তেমন করে ভ্যালিতে দাঁড়িয়ে দূরের ক্লিফে মন্দির দেখে তো আর আশ মিটে না। স্থির করলাম, সময় পেলে ওই ক্লিফে চড়বো। টাইগার নেস্ট মন্দিরের অন্য নাম পারো টাকসাং (Paro Taktsang)। হিমালয়ান বৌদ্ধ ধর্মের খুবই পবিত্র মন্দির ওটি।
ঠান্ডা বাতাসের চাবুক খেতে খেতে যখন ফিরে আসছিলাম একটুখানি উষ্ণতা দিয়েছিলো মঙ্গোলিয়ান অপ্সরী। তার নাম জানা জরুরী হয়ে পড়লো।

টাইগার নেস্ট
(চলবে…………)