দ্রুক ডায়েরি: চেলে লা ও দোচু লা গিরিপথ

SHARE
নবকুমার দত্ত, ভুটান থেকে ফিরে :
হিমালয়ের আদুরে কণ্যা ভূটান হিমালয়ের পূর্বকোল জুড়ে বিস্তার করে আছে। তাই সে এতো শীতল; তাই তার দরকার হয় এতো উষ্ণতা। উষ্ণতার কমতি হলেই অভিমানি কণ্যা জমে যায়। টাইগার নেস্ট থেকে নেমে এসে পারো টাউনে দুপুরের খাবার খেলাম। ‘স্পেশাল ফ্রাইড রাইস’ অর্ডার করেছিলাম। আধাঘণ্টা পর খাবার যা আসলো তা দেখে ক্ষুধা পালালো পশ্চিমের পাহাড় বেয়ে কলিমপং এর দিকে। পর্ক, চিকেন সমেত লাল চালের ফ্রাইড রাইস, সাথে আলু আর বাটার চিজ দিয়ে এক অখাদ্য। মনে পরে গেলো রংপুরে এক রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে ‘স্পেশাল ফ্রাইড রাইস’ চেয়ে মিলেছিলো বিফ ও চিকেন দিয়ে তৈরি রাইস। দুটি ঘটনার সাথে ‘স্পেশাল’ জড়িত। তাই স্পেশাল অর্ডার করার আগে জিজ্ঞেস করা নেয়া উচিৎ কি কি জিনিস পাতে থাকবে। নইলে ধরা। পেটে হাতি ঘোড়া খাওয়ার ক্ষুধা চেপে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গন্তব্য চেলে লা পাস (Chele La Pass)।
ভূটানিজ জোংখা ভাষায় ‘লা’ মানে পাস অর্থাৎ গিরিপথ। ভূটানের একেক ভ্যালি থেকে আরেক ভ্যালিকে ভাগ করেছে এই লা বা গিরিপথ গুলো। অনেকগুলো গিরিপথ রয়েছে ভূটানে। চেলে লা পাস ভাগ করেছে পারো ভ্যালি ও হা ভ্যালি (Haa) কে। পারো টাউন থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার উপরে পর্বত বেয়ে উঠে যাওয়ার পর মিললো এক অপূর্ব দৃশ্য। সমুদ্র সমতল থেকে ১২৪০২ফুট উঁচুতে এই গিরিপথ। দৃষ্টির সীমানায় উচ্চশির জমলহারি পর্বত (Jomolhari) ও জিচু ড্রাকে পর্বত (Jichu Drake) শ্বেতশুভ্র হিম টোপর পড়ে দাঁড়িয়ে। জমলহারিকে বলা হয় তাবৎ দুনিয়ার তৃতীয় উচ্চতম পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার বধূ। পারো ভ্যালি থেকে যতই উপরে উঠা যায় ততই বাড়তে থাকে শীতের কামড়। বদলে যেতে থাকে প্রকৃতি। হেইডিয়ান কাল (Hadean) থেকে আর্কিয়ান কালে (Archean) অনেক ভাঙচুরের পর আদল পাওয়া পর্বতেরা আকাশ ছোঁয়ার ভঙ্গিতে মূর্তিমান হয়ে আছে। তার ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে আধুনিক আর্কিটেকচার পথ করে নিয়েছে। আমাদের জীপটি মসৃণ গতিতে চালিয়ে ভীষণ আঁকাবাঁকা পথ ধরে উপরে উঠছে দক্ষ চালক। কখনো চোখে পড়ে পাইন গাছ থেকে ঝুলে থাকা অর্কিড। কখনো কখনো কুচিকুচি পাউডারের মতো তুষারের চাঁদর বিহ্বল করেছে আমার অনভ্যস্ত চোখদের। পথের ধারে ধারে পাইনের জঙ্গল বেয়ে বেরিয়ে আসা ঝরনার জল জমে বরফ হয়ে আছে। জমে থাকা জলের দিকে তাকালে মনে হয় ছুটে চলা শ্বেত ঘোড়ার দল স্থির ছবি হয়ে গেছে পাহাড়ের পটে কোনো যাদুকরের মন্ত্রের বলে।

বরফ হয়ে যাওয়া ঝর্ণার জল।
বেলে পাথরের পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে চোখে পড়ে লাটিমের মতো এক ধরণের স্তুপ। এর নাম ‘সা সা’ (tsa tsa)। এগুলো ধার্মিক বৌদ্ধদের স্থাপিত ছোট ছোট স্তুপ এগুলো। সর্বত্রই চোখে পড়েছে এই বস্তু। আর অজস্র প্রেয়ার ফ্ল্যাগ।

লাটিমের মতো স্তুপ ‘সা সা’ ।
একটু পর পর চোখে পড়ে মাইলপোস্টের গায়ে সতর্কবাণী। খুবই মজার এবং চমৎকার চমৎকার কথা লিখে রেখেছে মাইলপোস্টের গায়ে। যেমনঃ “After Whisky, Driving Risky”, “If you are married, divorce speed”, “Drive carefully, heaven is already full”. মনে পড়ে গেলো আমাদের পথঘাটের কথা। ওদের বিপদসংকুল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায় না; অথচ আমাদের পথ ঋজু ও সমতল হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন গড়ে ডজন খানেক মানুষের জীবন-প্রদীপ নিবে না গেলে আমাদের পথের বউনি হয় না! তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে। সূর্য ডোবার কিছু আগে সর্বোচ্চ পয়েন্টে পৌঁছানো গেলো। নিচে ডানের পারো ভ্যালি ও বামের হা ভ্যালিতে আঁধার নেমেছে গুটি গুটি পায়ে। কিন্তু দূরের হিমালয়ান রেঞ্জের চূড়ায় তখনো লাল আলো খেলা করছে তুষারের গায়ে গায়ে। ঝকমক করে নাকের নোলক দোলাচ্ছে জমলহারি পর্বত।
গাড়ি থেকে নেমে আসতেই শীতল বাতাসের চাবুক সাঁই সাঁই করে আছড়ে পড়লো মুখের উদোম ত্বকে। সামনে সুবিশাল পর্বতচূড়ো জুড়ে পাঁচ রঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ উড়ছে। দিগন্তের প্যানারোমিক প্রেক্ষাপটে শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো হিমালয়ান রেঞ্জ ভয়ংকর শীতল সুন্দর নিয়ে লুকোচুরি খেলছে অস্তমান সূর্যের আলোয়। এক মগ গরম কফি হলে বেশ জমতো। কিন্তু চেলে লা’তে ভূটানের পর্যটন বিভাগ বা ব্যক্তি মালিকানায় কোনো দোকান খোলা হয় নি। ঠাণ্ডায় রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছিলো তাই ব্যথা শুরু হলো হাতে। গাড়িতে গিয়ে বসলাম দ্রুত। গাড়ির ভিতরটা বেশ উষ্ণ, আরামদায়ক। চেলে লা’তে সন্ধ্যে নেমে এলো। চালক গাড়ি ছেড়ে দিলেন। মিউজিক প্লেয়ারে একটা ভূটানিজ গান বাজিয়ে দিলো। সান্তুরের মৃদু বাজনার সাথে একটা দোলানী সুরের গান। গানের কথা যদিও বোধগম্য নয়, তবুও বেশ আরাম লাগছিলো কানে। ঘুম এসে গেলো সহসায়। সকালে টাইগার নেস্ট এ ট্র্যাকিং করে পা দুটি আহত হয়ে ছিলো। তাই ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ঘুম চলে এলো। চালকের ডাকে ঘুম ভাঙলে দেখি রিসোর্টে ফিরে এসেছি। লেংচাতে লেংচাতে রুমে ঢুকে গরম জলে বেশ একটা স্নান দিলাম। তারপর কাপড় পড়ে একমগ গরম কফি নিয়ে লবিতে গিয়ে বসলাম। চোখের কোণা দিয়ে দেখলাম ঈয়েশিকে। ঝুঁকে কি যেনো করছিলো। স্প্যানিশ মসের মতো ঝরঝরে চুলগুলো কপাল ও গাল ঢেকে রেখেছে। দু’হাতে দু’কানের পাশে গুঁজে দিলো বেয়ারা চুলগুলো। ওর আরক্তিম পেলব গাল সদ্য চুলের আড়াল থেকে বেরিয়ে ইলেক্ট্রিকের আলোর ঝলমল করছিলো। যেনো ক্লিউপেট্রা সকল রূপ নিয়ে আবার ফিরে এসেছে দ্রুকের এই ধূসর ভ্যালিতে।
আমার একটু ঝিমুনি চলে এসেছিলো। জেসমিনের পরিচিত ঘ্রাণ নাকে যেতেই চেতনা ফিরে এলো। চোখ খুলে দেখি ঈয়েশি পাশে এসে বসেছে। জিজ্ঞেস করলো, ‘খুব ক্লান্ত?’। জানালাম ট্র্যাকিং ও অলটিচ্যুডের ধকল সইতে কষ্ট হচ্ছে। ঈয়েশি পরামর্শ দিলো স্পা’তে গিয়ে ফুট ম্যাসাজ করাতে। পরামর্শটা মনে ধরলো। ওর সাথেই গেলাম স্পা’তে। অত্যাচারিত পা গুলোতে একটা ঝরঝরে অনুভূতি নিয়ে ফিরে এলাম। ঈয়েশিকে জানালাম পারো টাউন থেকে কালই যাচ্ছি পুনাখা ও থিম্পু ঘুরতে। কিন্তু দু’দিন পর আবার ফিরে আসবো পারো’তে। সে রাতে ভূটানের সংস্কৃতি, অর্থনীতি, তরুণদের সমাজ-ভাবনা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করেছি ঈয়েশির সাথে। পরবর্তীতে এ নিয়ে বিস্তারিত লিখার চেষ্টা করবো।
ইয়েশির উষ্ণ হাত আলতো ঝাঁকিয়ে শুভরাত্রি জানিয়ে বিছানায় চলে এলাম। টেরই পাই নি ক্লান্ত অবসন্ন চোখে কখন ঘুম এসেছে। সকালে উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিলাম। গন্তব্য থিম্পু এবং দোচু লা পাস হয়ে পুনাখা টাউন। থিম্পুতে বিরতি হবে না। দোচু লা’তে আধাঘণ্টার একটা ব্রেক থাকবে। এরই ফাঁকে দোচু লা’র রূপের স্রোতে ভাসতে হবে।

দোচু লা’র স্তুপ।
আগেই বলেছি, দোচু লা অনেক গুলো গিরিপথের মধ্যে একটি। এই গিরিপথটি থিম্পু ও পুনাখাকে আলাদা করেছে। দোচু লা’র খ্যাতি সেখানকার ১০৮ টি স্তুপের জন্য। সমুদ্র সমতল থেকে ১০১৭১ ফুট উচ্চে এই গিরিপথ। জ্যেষ্ঠ রাণীমাতা অশি দর্জি ওয়াংমু ওয়াংচুক ১০৮টি স্তুপের সমন্বয়ে এই স্মৃতিসৌধটি তৈরি করেছেন। ২০০৩ সালে ভারতের আসাম প্রদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী অস্ত্রধারী দলের প্রায় ৩০টি ঘাঁটি ভূটানের মাটি থেকে উচ্ছেদকালে ভূটানি আর্মির শহীদ সদস্যদের স্মরণে এই স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। গোলাকার ডিবিতে তিনটি স্তরে সাজিয়ে স্তুপ গুলো বানানো হয়েছে। প্রতিটি স্তুপে ভগবান বুদ্ধের প্রতিকৃতি রয়েছে। বামে প্যানারোমিক ভিউতে পুরো দিগন্ত জুড়ে হিমালয়ান রেঞ্জের তুষারাবৃত পর্বতরাজি স্বমহিমায় অধিষ্ঠিত। পটাপট কিছু ছবি উঠিয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে বসলাম। গন্তব্য পুনাখা। হোটেল বুক করা আছে আগে থেকেই। গাড়িতে বসে উচ্চতার চাপ ভালোই টের পাচ্ছিলাম। কানের পর্দায় প্রচণ্ড চাপ পড়ছিলো। এটা একটা খুবই বিরক্তিকর অনুভূতি। কিন্তু কিছুই করার নেই। উচ্চতার সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া ভূটানের পথে চলা যাবে না। সন্ধ্যার কিছু আগে বাম পাশে পুনাখার খোলা ভ্যালি রেখে ডানের এক পাহাড় চুড়োয় হোটেলের ইয়ার্ডে এসে গাড়ি থামলো। ঠাণ্ডার অত্যাচার কমে এসেছে। কম শীতল বলেই পুনাখাকে আমার ভালো লেগে গেলো।

তুষারাবৃত পর্বতের দঙ্গল।
(চলবে ………………)