বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু কথা

SHARE

মোহাম্মদ তানভীর কায়ছার

ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পাসের হারের চিত্র নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। বোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত শিক্ষার মান ও শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় অর্জন নিয়ে অনেক হতাশাব্যঞ্জক বক্তব্য ও বিতর্কে মুখরিত হয়ে ওঠে। ভর্তি পরীক্ষার ফলের চিত্র দেখিয়ে যারা শিক্ষার মান নিম্নগামী হচ্ছে বলে এখনও সরব, তাদের বক্তব্যে অবশ্যই জাতি বিভ্রান্ত হয় এবং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়।

শিক্ষামন্ত্রীর গত ২৬ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে এক বক্তব্যে এই বিষয়টির অবতারণা করেছেন। তিনি বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এই ভর্তি পরীক্ষার ফল কোনোভাবেই শিক্ষার মানের সঠিক চিত্র হতে পারে না। কারণ এই পদ্ধতিতে শুধু উদ্দেশ্য থাকে, আসন পূরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী বাছাই করা এবং বাকিদের বাদ দেওয়া। এই ফলের পরিসংখ্যান কোনোভাবেই শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জিত মানের মাপকাঠি হতে পারে না। এই বিষয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অর্জনকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। মন্ত্রী বস্তুনিষ্ঠ একটি সত্যকে সামনে এনেছেন বলেই আমি মনে করছি।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার পাসের হার নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তি রয়েছে সেটি বেশ পুরনো। পাস-ফেল নির্ণয়ের নিরিখে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের বিষয়ভিত্তিক মোট আসন সংখ্যা পূরণের জন্যই আমরা পরীক্ষা নিয়ে থাকি। আর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মূলত আমরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষার্থী বাছাই করে থাকি। পাস-ফেলের পরিসংখ্যানটা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। মন্ত্রী ও সচিবের বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়ে যে প্রশ্ন রাখা হয়েছে, সেটি মোটেও অমূলক নয়। একজন শিক্ষার্থীকে প্রথম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত যে কারিকুলামে জ্ঞানদান করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় তার ওপর তেমন কোনো প্রশ্ন থাকে না বললেই চলে। দীর্ঘদিনের পড়াশোনার বাইরের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে রীতিমতো কোচিং সেন্টারের সহায়তা ছাড়া শিক্ষার্থীর আর কোনো উপায় থাকে না। এতে শিক্ষার্থী প্রশ্ন পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকে। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই তাদের অনেকেই খবর রাখি না যে, শিক্ষার্থীরা আগে কোন কোন বিষয় অধ্যয়ন করেছে। আমরা অনেক প্রশ্নই করে থাকি, যা এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর আয়ত্তের বাইরে_ এটি নিশ্চয়ই এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে। এই সমন্বয়হীনতা ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পদ্ধতিকে নিশ্চয়ই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিন-চার মাসের পড়াশোনায় বিশাল এক সিলেবাস, যার সঙ্গে আগের পড়াশোনার তেমন কোনো মিল নেই। তার উত্তর দিতে গেলে পরীক্ষার্থী সমস্যায় পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। আর আমরা যারা এর ফলের পরিসংখ্যান দেখে শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তাদের অবশ্যই বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটু ভাবতে হবে। বাংলাদেশের অনেক কিছুতেই আমরা টেকসই ও কাঙ্ক্ষিত মানে পেঁৗছাতে পারিনি, সেটা সত্য। আমরা কাঙ্ক্ষিত মানের দিকে এগোচ্ছি এটাও সত্য। তবে ধৈর্য নিয়ে কাজ করে এর সমাধান সম্ভব। বাস্তবতাবর্জিত সমালোচনায় তার সমাধান আসা মোটেও সম্ভব নয়। ঢাকাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক, সমাজবিজ্ঞান ও বিভাগে পরিবর্তনে ইউনিটের প্রশ্ন দেখলে বোঝা যাবে যে, সাধারণ জ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয়ের প্রশ্নের সঙ্গে শিক্ষার্থীর গত বছরগুলোতে অধ্যয়নকৃত কারিকুলামের সামঞ্জস্য নেই। এছাড়া ইংরেজি ও বাংলায় প্রশ্নগুলো নিরীক্ষা করলে দেখা যাবে, বিসিএস পরীক্ষার আদলে প্রশ্নগুলো করা হয়। অনেকে প্রশ্ন GRE, GMAT, SAT ইত্যাদি পরীক্ষার প্রশ্নের প্রতিরূপও বটে। এ ধরনের প্রশ্ন পদ্ধতি পরীক্ষার্থীর বয়স ও ভর্তি পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই আমি মনে করি। এই সামঞ্জস্য না থাকলে ভর্তি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার মান ও তার অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তোলা কতটা যৌক্তিক? তাই সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যালোচনা করার।

ভর্তি পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় পরীক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত মান যাচাই করা, তাহলে বিগত সময়ে, বিশেষ করে সবশেষ যেই বিষয়গুলো তারা অধ্যয়ন করেছে তার ওপর প্রশ্ন করাই শ্রেয়। বিসিএস, GRE, GMAT, SAT-এর স্টাইলে প্রশ্ন করলে মূল উদ্দেশ্য যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি বিভ্রান্ত হবে পরীক্ষার্থীরাও। সঙ্গে সঙ্গে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় এর নেতিবাচক যে প্রভাব পড়েছে, এতদিন তার থেকেও উত্তরণ সম্ভব হবে না। বিষয়টি নিয়ে যে একেবারে ভাবা হচ্ছে না তাও নয়। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. এসএম ইমামুল হকের বিশেষ উদ্যোগে সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল এ বিষয়ে একটি বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছে, যা পরবর্তীকালে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনুসরণ করতে পারে। প্রসঙ্গত, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বছর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞানের গতানুগতিক প্রশ্ন পদ্ধতি বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ ভর্তি পরীক্ষা এইচএসসি সিলেবাসের ওপর নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থী অতীতে যেসব বিষয়ে অধ্যয়ন করেছে, ভর্তি পরীক্ষায় শুধু সেসব বিষয়ের ওপরেই প্রশ্ন থাকবে। এ ছাড়া বিভাগ পরিবর্তন ইউনিটটি বাদ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার্থী নিজ ইউনিট ও বিভাগ পরিবর্তনের জন্য শুধু এইচএসসিতে তার অধ্যয়নকৃত বিষয়গুলোর ওপর প্রশ্নের উত্তর দেবে। যেমন বিজ্ঞান, বাণিজ্যের ও মানবিকের পরীক্ষার্থীরা শুধু পঠিত বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দেবে। বিভাগ পরিবর্তনের জন্য নতুন করে আলাদা পরীক্ষা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই পরীক্ষা পদ্ধতি যেমন উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনি বিভাগ পরিবর্তনের জন্য আলাদা পরীক্ষা না থাকায় সময় ও অর্থেরও সাশ্রয় হবে বলে মনে করছি। ভর্তি পরীক্ষা ন্যাশনাল কারিকুলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে এই পদ্ধতিটি যথেষ্ট যৌক্তিক বলে মনে করছি। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন কাঠামোও ন্যাশনাল কারিকুলামের সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন করতে কর্তৃপক্ষকে প্রাথমিকভাবে বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রশ্ন কর্তাদের সিলেবাস অনুযায়ী বই সরবরাহও করা হয়েছে। দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে। এতে ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য ও তার ফল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এই বিষয়ে সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষাগুলোও সমন্বিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে একই দিনে এবং একই সঙ্গে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার উপায় খোঁজা জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অর্জন যাতে হেয় না হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যাতে কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার জরুরি সমন্বয় প্রয়োজন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে শিক্ষামন্ত্রীর ভূমিকা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবিদার। ভর্তি পরীক্ষার বিষয়েও তার বক্তব্য যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক মনে করছি এবং এই বিষয়ে তার নেতৃত্বে শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষদের সমন্বয়ে একটি বাস্তব, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সমন্বিত পদ্ধতির বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করছি।

চেয়ারম্যান, ইংরেজি বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, kaisar_tanvir@yahoo.com