গৌরবের আলোকিত পঞ্চাশ বছর

SHARE

মামুনুর রশিদ:
১৯৬৬ থেকে ২০১৬ সাল, গৌরবের দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর পাহাড় ঘেরা, সবুজে মোড়া দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাঙ্গন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি এ চার বিভাগে ৭ শিক্ষক ও ২০২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে আজকের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনোই থেমে থাকেনি বিশ্ববিদ্যালয়টির জয়রথ। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে দেশ বরেণ্য অনেক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড.মুহাম্মদ ইউনূছ এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ছিলেন। বিশ্বখ্যাত বিশ্বতত্ত্ববিদ, পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম (জে.এন.ইসলাম) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়া সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আহমদ শরীফ, সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, চিত্রশিল্পী রশিদ চৌধুরী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট আবুল মোমেন, সাবেক জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, অপরাজেয় বাংলার স্থপতি ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক ড. অনুপম সেন, শিক্ষাবিদ ও লেখক আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সাহিত্যিক ও প্রাক্তণ অধ্যাপক আবুল ফজল, সাহিত্যিক এবং ভাষাবিজ্ঞানী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্ছুরি কমিশনের (ইউজিসি) বর্তমান চেয়ারম্যান এবং চবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর, চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুন, চিত্রশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, কবি ময়ুখ চৌধুরী, কবি বিমল গুহ, বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আল আমীন, আইটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ সিদ্দিকী,  ড. সরোজ কান্তি সিংহ হাজারী, ড. গাজী আসমত, ড. মাহবুবুল হকের মতো দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। পঞ্চাশ বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শীর্ষে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বাংলাদেশ সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন চবির শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ৪১ জন সচিব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক সহ আরও অনেকে রয়েছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। এসএ গেমসে স্বর্ণপদক বিজয়ী ক্রীড়াবিদ মাহফুজা খাতুন শিলা, সরীসৃপ প্রাণীর শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী সাজিদ আলী হাওলাদার সহ আরও অনেক শিক্ষার্থীই কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন। দেশের সংগীত অঙ্গনের পুরোধাদের অধিকাংশই চবির শিক্ষার্থী। দেশ সেরা ব্যান্ড সোলসের পার্থ বডুয়া, রেঁনেসা ব্যান্ডের নকীব খান, দলছুটের বাপ্পা মজুমদার, এস.আই.টুটুল সবাই চবির শিক্ষার্থী ছিলেন।

১৭৫৪ একরের বিশাল আকৃতির সবুজে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু আবার কোথাও আঁকাবাঁকা, গর্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নয়নাভিরাম পাহাড়। পুরো ক্যাম্পাস দেখতে অপরূপ। দৃষ্টিজুড়ে নান্দনিক, অপ্সরী, প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত। এ যেন এক নান্দনিক সৌন্দর্যের পুরোধা। সৌন্দর্য পিপাসুদের কাছে পরম আকর্ষণীয়, মনোমুগ্ধকর। প্রকৃতির সতেজ বাতাস আস্বাদন-আঙিনা। ভ্রমণের পিপাসা মেটায় চিরসবুজ-শ্যামল এই সোনালি ক্যাম্পাস। পৃথিবীর একমাত্র শাটল ট্রেন, ঝুলন্ত সেতু, প্রাকৃতিক ঝরনাধারা, হতাশার মোড়, বিশ্বশান্তি প্যাগোডা, সুনামি গার্ডেন, জারুলতলা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মায়া হরিণ, শহীদ মিনার, লাইব্রেরি চত্বর, সুবিশাল খেলার মাঠ, কাটা পাহাড় রাস্তা, ঝুপড়ি, বিশালাকৃতির পাহাড়- এসব দৃশ্য যারপরনাই বিমোহিত করে শিক্ষার্থীদের। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা চবি কেবল আগামীর দেশ গঠনের কারিগর তৈরি করছে না, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আঙিনায় আশ্রিতও করেছে। দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। রয়েছে দেশী-বিদেশী, দুস্প্রাপ্য ও দুর্লভ বই, সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা, জার্নাল ও পান্ডুলিপিসহ আড়াই লক্ষাধিক বইয়ের একটি সংগ্রহশালা (কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি)। ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন খ্যাতিমান শিল্পীর নজরকাড়া সব স্থাপত্যকর্ম। এসব স্থাপত্যশিল্প দেখলেই আমাদের মধ্যে দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দেশপ্রেম জেগে উঠে। ক্যাম্পাসে শোভা পাচ্ছে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের জন্য চবি কলাভবনের সামনে নির্মিত স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ। ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত চবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর সন্তানদের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখে গোলচত্বরে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’। এছাড়া একটু দক্ষিণেই আছে বিরল প্রজাতির নানারকম গাছ। সামনে গেলে দেখা মিলবে পাহাড়ের ওপর ছোট্ট একটা ভবন। যার দুই পাশে উপরে উঠার জন্য সিঁড়ি আর মাঝখানে আছে আকর্ষণীয় মিঠাপানির লেক। সন্ধ্যা হলেই এখানে দেখা মেলে হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর। প্রধান ফটক থেকে সামনের দিকে কাটা পাহাড়ের রাস্তা ধরে হাঁটলে দেখা যাবে আধুনিক স্থাপত্যের বাণিজ্য, সমাজবিজ্ঞান ও কলা অনুষদ ভবন। আছে শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, প্রশাসনিক ভবন, আইটি ভবন, চাকসু, বিজ্ঞান অনুষদ ও শিক্ষার্থীদের আড্ডাখানা কলা অনুষদের ঝুপড়ি। কলা অনুষদের পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক ঝরনা। ছাত্রী হলের দক্ষিণ-পূর্বে দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে গেলে পাওয়া যাবে বোটানিক্যাল গার্ডেন। আছে বিরল প্রজাতির ঔষধি ফুল ও ফলের গাছ। জীববিজ্ঞান অনুষদ, মেরিন সাইয়েন্স, ফিশারিজ ইনস্টিটিউট, জিমনেসিয়াম। ক্যাম্পাসেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ আছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তংচঙ্গা, ম্রোসহ বেশ কয়েকটি উপজাতি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছে বাঙালির সংস্কৃতি। পড়ন্ত বিকালে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা ছবি তোলার মোহনীয় মনোরম পরিবেশও আছে। পথ চলার পঞ্চাশ বছরে চবিতে বর্তমানে ৭টি অনুষদে ৫২টি বিভাগ, ৬টি ইনস্টিটিউট এবং ৫টি গবেষণা কেন্দ্রে ২৪২৮৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এছাড়া ৭টি ছাত্র হল ও ৩টি ছাত্রী হল এবং ২টি নির্মানাধীন ছাত্র ও ছাত্রী হল রয়েছে।

পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’ উপলক্ষে উৎসবের হাওয়া বইছে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে। বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে পুরো ক্যাম্পাস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সব জায়গায় প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাদের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। সত্তর, আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকের ক্যাম্পাস জীবনে বিভিন্ন ছবি পোস্ট করে অনেকেই সেই ছবির আবেগধর্মী শিরোনাম দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন অতীতের সেই ক্যাম্পাসে। আমরা বর্তমানরাও প্রস্তুত রয়েছি সবাইকে বরণ করে নিতে। চবিতে যেন এ এক উৎসবের আমেজ, অন্য রকম আমেজ, সুবর্ণ জয়ন্তীর আমেজ, গর্বের পঞ্চাশ বছর পূর্তির আমেজ, সাবেক-বর্তমানের একত্রে আনন্দে মেতে চবিয়ান হয়ে ওঠার আমেজ।

শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই একটি জাতির মেরুদন্ড, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মেরুদন্ড। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সেই মেরুদন্ডের অন্যতম কান্ডারী। দেশে যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং একটি জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় উজ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় আরও দীপ্তিময় হোক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পথচলা। এগিয়ে যাক শিক্ষা, এগিয়ে যাক বাংলাদেশ, এগিয়ে যাক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মামুনুর রশিদ: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mamunurrashidmiajee@gmail.com