বিজয় দিবস ও তারুণ্য ভাবনা

SHARE

ড. নিয়াজ আহম্মেদ:
তারুণ্যকে কোনো বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না ঠিক, কিন্তু তরুণদের মধ্যে যদি তারুণ্য না থাকে তাহলে দেশ সামনের দিকে এগোবে কিভাবে? তারুণ্যের কোনো বয়স, স্থান-কাল-পাত্র নেই। মানসিক শক্তি তারুণ্যকে ধরে রাখতে পারে। তারুণ্য মনে, মননে, শক্তিতে, সামর্থ্যে এবং ভাবনায়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে আমাদের তারুণ্য। এখানে বয়স কোনো বাধা ছিল না, ছিল না লিঙ্গ, অঞ্চল কিংবা অন্য কোনো বাধা। যে তারুণ্যের মধ্যে ছিল তরুণ-তরুণী, মাঝ বয়সী এবং নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। এদের আমরা কোন ফ্রেমে বাঁধব? যে তরুণ তার জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, যে তরুণী তার নিজের সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, যে বৃদ্ধ তাঁর সামর্থ্য যা-ই থাকুক না কেন, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, তাঁদের আমরা কিভাবে ভুলব। কত না কৌশল তাঁদের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর এ দেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে অবলম্বন করতে হয়েছে। কখনো বা রোগী সেজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, আবার সাজতে হয়েছে হকার কিংবা আরো কত কি। এমন অভিনয় করে তথ্যপাচার কিংবা নিজেকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো। লক্ষ্য ও প্রতিপাদ্য একটি স্বাধীনতা অর্জন। দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা। আজ বিজয়ের মাসে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি।

একাত্তরে আমাদের জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাত কোটি। আজ আমাদের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটিরও বেশি। বয়সে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি। আমাদের এ তরুণরা আমাদের গর্ব এবং আগামী দিনের পথচলার শক্তি। আমাদের অনেক কিছু নির্ভর করে এমন তরুণদের ওপর। তবে আজকের তরুণ আর একাত্তরের তরুণের মধ্যে সংখ্যাগত যেমন ব্যবধান রয়েছে, তেমনি বয়েছে আরো অনেক কিছু। কেননা তারা যুদ্ধ দেখেনি। একাত্তরের তরুণদের মধ্যে ছিল না আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির ছোঁয়া, ছিল না ব্যাপক শিক্ষা ও জ্ঞানভাণ্ডার। তবে তাঁদের মধ্যে বড় ছিল শক্তি, চেতনা, মনোবল, উৎসাহ ও উদ্দীপনা, যার পুরোটা ঘিরে ছিল স্বাধীনতা। ছিল এমন এক নেতৃত্ব, যাঁর মধ্যে ছিল না কোনো খাদ, সন্দেহ আর অবিশ্বাস। নেতার গুণাবলি ছিল এমন, যেখানে আস্থা ছিল শতভাগ। এমন এক নেতা ছিলেন, যেখানে সবাই উন্মুখ ছিল ডাকের অপেক্ষায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন নেতা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে বিজয়ের মাসে আমরা এমন এক নেতৃত্ব চাই এবং আমাদের বিশ্বাস, আমাদের তা আছে যে নেতৃত্ব আমাদের স্বাধীনতার সুফল বয়ে আনতে সহায়তা করবে। আমাদের সামনে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। একাত্তরের তরুণ আর আজকের তরুণদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকতে পারে। আমরা বিভিন্নভাবে একে বিশ্লেষণ করতে পারি, কিন্তু ব্যবধান যা-ই থাকুক না কেন, সময়ের জন্য আজকের তরুণরা শিক্ষাদীক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অধিক ক্ষমতাধর একেকজন তরুণ, যাদের রয়েছে মেধা ও সাহস। জনসংখ্যার কাঠামো বিচারে অনেক উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের তরুণদের সংখ্যা ঢের বেশি। এরা সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কাজে পারদর্শী ও দক্ষ। এদের এমন এক শক্তি রয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিজে থেকে নিজেরা তাদের সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাচ্ছে। নিজেদের সুযোগ নিজেরা তৈরি করে দেশে এবং দেশের বাইরে তাদের সক্ষমতাকে প্রকাশ করছে। তবে বড় সমস্যা দেখা দেয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে। কারো জন্য অপেক্ষা করার সময় তাদের নেই। নিজেই হয়তো নিজেকে নেতা হিসেবে বনে যায়। সঠিক নেতৃত্ব ও নির্দেশনা পেলে এরা হয়তো আরো অনেক দ্রুত এগিয়ে যেতে পারত।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া তরুণসমাজকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা সম্ভব নয়। তাদের সঠিক পথ দেখাতে, তাদের মধ্যে সাহস জোগাতে এবং সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীলতার প্রকাশে সহায়তা করতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্ব। দেশপ্রেম জাগ্রত করতে পারে একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা তার দল। যেমনটি পেরেছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। এখানে নেতৃত্ব যেমন ছিল রাজনৈতিক পাশাপাশি আর্থসামাজিক। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প মেলা কঠিন এ কারণে, এমন নেতৃত্ব একাধারে কঠিন ও এর মধ্যে আস্থাশীলতা কম। দেশ পরিচালিত হয় রাজনৈতিক নেতা দ্বারা। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় এমন নেতৃত্বই গণতান্ত্রিক। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সঠিক নেতৃত্বের গুণাবলি কমে যাওয়ায় তরুণরা নেতাদের প্রতি আর আস্থা রাখতে পারছে না। তাদের প্রতি আস্থাহীনতার একটি বড় কারণ হতে পারে, তরুণদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা। নিজেদের জন্য ব্যবহার না করে তাদের শুধু যে কাজে ব্যবহার করলে আমরা দ্রুত উন্নত দেশের দিকে ধাবিত হব। সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতটাই শক্ত ও নিখুঁত, যেখানে কাজের কাজ বেশি। তবে এ কথা সত্য যে রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকেও তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক মানসিকতা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের উদীপ্ত করা যায়। তবে বেশ কঠিন এ কারণে, এখানেও দুই পক্ষ স্বচ্ছ নয়। এখানেও তাদের ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। কোনো বিষয় নিয়ে দেখা যায় পক্ষ শক্ত ও শক্তিশালী, আবার অন্য বিষয়ে নির্বাক।

আজকের বাংলাদেশকে ভাবতে হবে উন্নত বাংলাদেশ হওয়ার লক্ষ্যে। এ পথে আমাদের একমাত্র ভরসা আমাদের তরুণসমাজ। তরুণদের মধ্যে যদি তারুণ্য না থাকে, তাহলে আমরা স্থবির হয়ে পড়ব। তরুণরা একা নিজেদের উদ্যোগে যখন অনেক কাজ করতে পারে, যেখানে এ কাজে বাইরে থেকে নেতৃত্ব কিংবা নিজেদের মধ্য থেকে নেতৃত্বের বিকাশ পারে দেশকে এগিয়ে নিতে। আজকের বাংলাদেশকে আমরা এভাবে দেখতে পারি দেশটি উন্নয়নের ট্রেনে উঠে গিয়েছে। এখন ট্রেনটিকে চালিয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। আর এ কাজে চালকের ভূমিকায় থাকবে আমাদের তরুণসমাজ। বাংলাদেশ আজকে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তা একাধিক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমান সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে মিশন ও ভিশন নিয়ে মাঠে রয়েছেন এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর কাজের এক চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি কাজ করতে পারে আমাদের দক্ষ শিক্ষিত তরুণসমাজ। যে সমাজ আক্ষরিক অর্থে যদি কোনো নেতিবাচক আসক্তির সমাজ না হয়, যে সমাজ যদি বিভ্রান্তির সমাজ না হয়, যে সমাজ স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত সমাজ, বাংলাদেশ গড়ার সমাজ, আগামী দিনের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সমাজ, সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়ার সমাজ। আমরা এমন সমাজে এমন তরুণ চাই, যারা সঠিক নেতৃত্ব মানবে এবং নিজেদের নেতৃত্বের গুণাবলির বিকাশ ঘটাবে। মহান বিজয় দিবসে এমন আশা আমরা সবার কাছে রাখতে পারি।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, neazahmed_2002@yahoo.com